কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৫ এ ০৬:২৫ PM
কন্টেন্ট: পাতা

২৭ অক্টোবর ২০১৬ তারিখ থেকে ‘চাইল্ড হেল্পলাইন-১০৯৮’ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। শিশুদের সুরক্ষায় দেশব্যাপী সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয়ের সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ইউনিসেফের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ‘চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮’ পরিচালিত হচ্ছে। দেশের যেকোনো প্রান্তের শিশু কোনো ধরনের সহিংসতা, নির্যাতন ও শোষনের শিকার হলে শিশু নিজে অথবা শিশুর হয়ে অন্য যে কোন ব্যক্তি বিনামূল্যে হেল্পলাইন-১০৯৮ এ ফোন করে সহায়তা চাইতে পারে ।
এটি সকল প্রকার প্রভাব বা চাপমুক্ত থেকে শিশুর সুরক্ষা প্রদানে সকল প্রকার গোপনীয়তা রক্ষা করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। দিন/রাত ২৪ ঘন্টা হেল্পলাইনটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। হেল্পলাইন এর কর্মীগণ শিশুর কথা মনোযোগসহকারে শোনেন এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সেবা(তথ্য প্রদান,তাৎক্ষণিক/সরাসরি পদক্ষেপ, কাউন্সেলিং) প্রদান করে । সমস্যার ধরণ ও প্রয়োজন অনুসারে সেবা প্রদানকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারের নিকট সেবাগ্রহীতাকে রেফার করে।
চাইল্ড হেল্পলাইনের উদ্দেশ্য:
• শিশুর জরুরী সহায়তায় টোল-ফ্রি শর্ট কোড এ অভিগম্যতা;
• একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক/প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক পরিষেবা স্থাপন করা, যা শিশুর বিশেষ যত্ন, সুরক্ষা এবং জরুরী পরিষেবা প্রদান করে;
• শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে শিশু অধিকার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি;
চাইল্ড হেল্পলাইন-১০৯৮-এর মূল পরিষেবা সমূহ:
• শিশুদের নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে রক্ষা করা;
• শিশু পাচার রোধে জরুরি সহায়তা প্রদান করা;
• ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা;
• শিশুদের আইনি সেবা পেতে সহায়তা করা;
• ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা থেকে শিশুকে উদ্ধার করা;
• টেলিফোনে তথ্য এবং কাউন্সেলিং সেবা প্রদান করা;
• শিশু সুরক্ষায় নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে পরামর্শ দেওয়া;
• বিদ্যমান যেকোন সামাজিক সুরক্ষা সেবা পেতে সহায়তা প্রদান করা।
চাইল্ড হেল্পলাইনের পরিষেবার মূল্যবোধ:
• শিশু-কেন্দ্রিক অনুশীলন;
• বৈষম্যহীনতা;
• অ-বিচারিক;
• শিশুর ক্ষমতায়ন এবং
• গোপনীয়তা বজায় রাখা।
চাইল্ড হেল্পলাইন পরিচালনা এবং ব্যবস্থাপনা:
কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত কল সেন্টার (CCC) 'চাইল্ড হেল্পলাইন-১০৯৮' একটি আদর্শ পরিচালনা নির্দেশিকা (SOP) দ্বারা পরিচালিত হয়। সেবা প্রার্থীর অডিও এবং সমস্ত তথ্য নির্ভরযোগ্য সফটওয়্যারে সুরক্ষিত থাকে। সংরক্ষিত তথ্য কঠোরভাবে গোপনীয়তা বজায় রেখে শিশুর (নির্যাতিত) কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য ব্যবহার করা হয়। হেল্পলাইনটি কল এজেন্ট (২৪), মনো-সামাজিক কাউন্সেলর (৩), ম্যানেজার (১), নির্বাহী কর্মকর্তার (১) ব্যবস্থাপনায় সমাজসেবা অধিদফতরের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে জাতীয় প্রকল্প পরিচালকের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানে এবং মাননীয় মহাপরিচালক মহোদয়ের সার্বিক নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে। মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করার জন্য এবং CHL-এর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এটির একটি কারিগরি কমিটি রয়েছে। এর পরিষেবাগুলি সফটওয়্যায়ের মাধ্যমে মূল্যায়ন ও নথিভুক্ত করে রিপোর্টগুলি প্রস্তুত করা হয়। সফটওয়্যারে সংরক্ষিত ডাটা ড্যাসবোর্ড এর মাধ্যমে প্রাপ্ত কলের সংখ্যা, কেস তালিকা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে।
চাইল্ড হেল্পলাইন-১০৯৮ এর সহায়তার প্রবাহ চিত্রঃ

| এক নজরে চাইল্ড হেল্পলাইন-১০৯৮ এর অর্জন (ডিসেম্বর ২০১৫ থেকে আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত) | |
| চাইল্ড হেল্পলাইন-১০৯৮ এর মাধ্যমে সেবা প্রদান: | জন |
| সর্বমোট কল গ্রহণ | ২২,৪৮,৮৮৭ |
| শিশু বিবাহ বন্ধে সহায়তা | ৮,২০২ |
| শিক্ষা সম্পর্কিত ( একাডেমিক, হোমওয়ার্ক, লেখাপড়া নিয়ে দুঃচিন্তা, শিক্ষক ও স্কুল কর্তৃপক্ষ) | ৩১,৫৯১ |
| শিশু নির্যাতন সম্পর্কিত | ৫৪,১২২ |
| স্বাস্থ্য সম্পর্কিত | 11,985 |
| মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতা(psychsocial wellbeing) | 15,789 |
| অভিভাবকত্ব/শিশু লালন-পালন (parenting/child raring | 749 |
| দুর্বলতা (vulnerability) | 8,752 |
| আইনী সহায়তায় সহযোগিতা | 27,855 |
| শিশুসুরক্ষায় অন্যান্য তথ্য বিনিময় | 10,90,627 |
| করোনা ভাইরাস ( কোভিড-১৯) ও অন্যান্য বিষয়ক (স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা) | 7,55,191 |
| বিভিন্ন সরকারি,বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সাথে সেবা গ্রহণের জন্য যোগযোগ/ লিংক করে দেয়া | 1,12,832 |
| মনোসামাজিক কাউন্সেলিং সেবা প্রদান | 70,887 |
কেস স্টাডি ১:
ধর্ষণের শিকার শিশুর সেবায় অবহেলা নয়, নিতে হবে দ্রুত পদক্ষেপ
চাইল্ড হেল্প লাইন ১০৯৮ এর প্রচারনায় বাড়ছে জনগনের সচেতনতা। যখন কোন শিশু প্রাপ্য ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তখনই প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ১০৯৮ এ ফোন করছেন সমাজের সচেতনব্যক্তি এমন কি শিশুরা। ঠিক এমন একটি সেবা থেকে বঞ্চিত শিশুর জন্য সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ থেকে একজন সচেতন কলার ১০৯৮ এ ফোন করেন। তিনি জানান ১৫ বছর বয়সের একজন মেয়ে শিশুর সরলতার সুযোগ নিয়ে তার কথিত প্রেমিক ধর্ষণ করেছে। শিশুটির নাম নাদিরা ( ছদ্মনাম)। কিন্তু শিশুটির আপনজন কেউ না থাকায় সে এখন পর্যন্ত কোন সেবা পাচ্ছেনা। উনি শিশুর সমস্ত তথ্য প্রদান করেন এবং বলেন এই মূহুর্তে শিশুটির হেল্প লাইনের সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন।উক্ত তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে ১০৯৮ এর পক্ষ থেকে কলারের দেওয়া সব তথ্য নিয়ে, শিশুর সাথে যোগাযোগ করা হয় এবং ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং কয়েক ঘন্টা অতিক্রম হয়েছে এর মধ্যে সে কোন সহযোগিতা পায়নি বরং নানা প্রকার অপমান আর লাঞ্ছনার শিকার হয়েছে। শিশুটির স্থান হয় বর্তমান মহিলা মেম্বারের বাড়িতে। উল্লেখ যে,শিশুর বাবা অনেকদিন আগেই মারা গিয়েছেন এবং তার মা অন্যত্র বিয়ে করে সংসার করছেন,এরপর থেকে শিশুর আশ্রয় হয়েছে তার বড় চাচার বাড়িতে। চাইল্ড হেল্প লাইন কর্মকর্তা বিষয়টি স্থানীয় সমাজসেবা অফিসার, প্রবেশন অফিসার মহোদয় কে প্রথমে অবগত করেন পাশাপাশি উক্ত থানার পুলিশ কে শিশুর পরিস্থিতি অবহিত করেন, তথ্যটি পাওয়ার পর পুলিশ নড়েচড়ে বসেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহনে আশ্বাস দেন। কিছুটা সময় অতিক্রম এর পর কলার জানায় থানা থেকে একজন পুলিশ কর্মকর্তা শিশুর বিষয়টি তদন্ত করতে আসেন,ঘটনার সত্যতা পেয়ে শিশুকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতাল, One Stop Crisis Centre (OCC)তে ভর্তির জন্য ব্যবস্থা গ্রহন করেন।শিশু কল্যান বোর্ডের কর্মকর্তাদের সহায়তায় শিশুর অভিভাবকগন থানায় মামলা রুজু করেন এবং কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আসামিকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে ১০৯৮ থেকে শিশুর অভিভাবকদের কাউন্সেলিং করা হয়। কারণ শিশু পরিস্থিতির শিকার, এজন্য শিশুটি দায়ী নয়, এই মুহুর্তে তার পাশে থাকা, সহনশীল হওয়া, তাদের দায়িত্ব । তার যে কোন প্রয়োজনে পুনরায় হেল্প লাইন এ ফোন করতে অনুরোধ করা হয়। কয়েকদিন পর শিশু হাসপাতাল থেকে ফিরলে কথা হয়, সে এখন স্বস্তি অনুভব করছে, শিশুকে কাউন্সেলিং সেবা চলমান রয়েছে।
শিশুর আশে পাশের আত্মীয় স্বজন শিশুর বিষয়টি নিয়ে ভেবেছিলেন যে,শিশুর জন্য সেবা পাওয়া খুব কষ্টকর হবে, কিন্তু ১০৯৮ এর তড়িৎ সেবা দেখে তারা অভিভূত হন এবং হেল্পলাইনকে অসংখ্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
কেস স্টাডি ২:
বাল্য বিয়ের কুফল তো অনেক পড়া হয়েছে চলুন আজ জলজ্যান্ত উদাহরণ দেখি!!!
আমাদের দেশে এখনো অনেক মানুষ আছে যারা বাল্য বিয়ে কে খারাপ বলে মনে করেন না । সরকারি-বেসরকারি হাজারো প্রচারণা ও পাঠ্যবইয়ে লিখে দেওয়া বাল্য বিয়ের কুফলকে তোয়াক্কা না করে সবে মাত্র বয়ঃসন্ধিতে যাওয়া শিশু মেয়েটিকে বিয়ের সাজে সাজিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয় শ্বশুরবাড়িতে। বিয়ে দেবার পর শিশুটির জীবন যখন নষ্টের দ্বারপ্রান্তে চলে যায় তখন পরিবার বুঝতে পারেন কত বড় ভুলটাই না করা হয়ে গেছে। এরকমই এক হতভাগ্য পিতা ১০৯৮ এ কল দিয়ে জানান তিনি ১৪ বছর বয়সে তার কন্যা সন্তান মর্জিনাকে (ছদ্মনাম) বিয়ে দিয়ে দেন। কিশোরী মর্জিনার জন্য স্বামী- শ্বশুরবাড়ির সকলের মনযুগিয়ে চলা বেশ কঠিন কাজ ছিল। তবুও সে চেষ্টা করে যাচ্ছিল কিন্তু এর মধ্যেই শিশু মর্জিনা টের পেল তার শরীরের ভেতরে আরেকটি প্রাণের স্পন্দন । তার উপর অপ্রাপ্তবয়সে গর্ভধারণের কারণে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে থাকে। খেতে না পারা, বমি হওয়ার কারণে শারীরিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়ে। হঠাৎ শারীরিক এই পরিবর্তনের সাথে সে মানিয়ে নিতে পারছিলনা বলে ঠিকভাবে সংসারের কাজও করতে পারছিল না মর্জিনা। ফলশ্রুতিতে সে স্বামি ও শ্বশুরবাড়ির সবার কাছে হয়ে উঠে অপ্রিয় ও অবহেলিত। আর তাই গর্ভকালীন সময়েও চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয় সে। শুরু হয় পারিবারিক কলহ ও নির্যাতন। সঠিক শুশ্রূষা ও চিকিৎসা না পেয়ে মর্জিনা এক ছেলে শিশু জন্ম দেয়। শারীরিক দূরবস্থা ও মানসিক টানাপোড়নে শিশু মর্জিনা আরও অসুস্থ হয়ে পড়লে শশুড়বাড়ির মানুষ তাকে ২ মাসের শিশু তামিমকে রেখে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। মর্জিনার বাবা নানাভাবে চেষ্টা করেও শিশু তামিমকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়ে রাত ১১ টায় সহায়তা চেয়ে কল করে ১০৯৮ এ। সাথে সাথেই আমরা ১০৯৮ শিশু তামিমের বাবাকে কল দিয়ে শিশুর অধিকার, শিশুর চাহিদা ও শিশু আইন সম্পর্কে অবগত করি ও কাউন্সিলিং করি। শিশু মর্জিনার এখন যে শারীরিক ও মানসিক অবস্থা সেটারও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। অবশেষে তামিমের বাবা তার ভুল বুঝতে পারেন এবং তার কৃতকর্মে জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং সকালেই শিশুকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যাবে বলে কথা দেয়। পরদিন সকালেই তামিমের বাবা তাকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেয়। পাশাপাশি সকালে স্থানীয় সমাজসেবা অফিসার ও চেয়ারম্যানকে তথ্য দেয়া হলে তারা শিশুর পরিবারের স্বশরিরে যান এবং তাদের সমস্যার কথা শুনে কিশোরী মা ও শিশুকে কেস ম্যানেজমেন্টের আওতায় আনেন, এবং পারিবারিক ভাবে মিমাংসার ব্যাবস্থা করেন। সেই সাথে ১০৯৮ ও পরিবারটিকে ফলোআপের মাধ্যমে কয়েকদফা কাউন্সেলিং করে। উপরের ঘটে যাওয়া ঘটনাটি ঠিক পাঠ্য বইয়ে পড়া বাল্য বিয়ের কুফল গুলোই যেন একটা একটা করে শিশুর মর্জিনার জীবনে বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে। বাল্য বিয়ের কুফলের জলজ্যান্ত উদাহরণ ত মর্জিনার জীবনটি। আর কোন মর্জিনার জীবন যেন এমন বিভীষিকাময় না হয় সে জন্য কাজ করে যাচ্ছে ১০৯৮। তবে এমন হাজারো মর্জিনাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে সকলকে।
কেস স্টাডি ৩:
"তথ্য বিভ্রাটে জেএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনে ভোগান্তি, হতাশায় নিমজ্জিত শিশু"
করোনা মহামারীতে স্কুল বন্ধ থাকলেও বিভিন্ন ক্লাসের শিক্ষার্থীদের দাপ্তরিক গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য মাঝে মধ্যেই স্কুলের প্রশাসনিক ফটক খোলা থাকে। জেএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনের কাজ চলছিল বলে বন্ধুর সাথে স্কুলে রেজিস্ট্রেশন করতে যায় ৮ম শ্রেণির ছাত্র তামিম (ছদ্মনাম)। কিন্তু স্কুলে গিয়ে তামিম জানতে পারে জন্ম নিবন্ধনে তার বয়স তুলনামূলক ভাবে বেশি বলে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে জেএসসি পরীক্ষা দেয়ার অনুপযোগি বলে মনে করছে এবং তাকে অন্য স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য পরামর্শ প্রদান করে। আকস্মিক এই ঘটনায় তামিম মানসিকভাবে ভেঙ্গে পরে । তামিমের এই বিপদে বন্ধু রোহান পাশে দাড়ায় ১০৯৮ এর সেবা সম্পর্কে তথ্য নিয়ে। তামিম কল করে জানায়, “আমি আমার প্রিয় স্কুল ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না, আমি আমার বন্ধুদের সাথে এই স্কুলেই পড়তে চাই। আমি তো কোন দোষ করিনি তবে কেন এমন শাস্তি?” তামিমের প্রতিটি কথায় ব্যক্ত হচ্ছিল তার কষ্ট আর হতাশার কথা। শিশুর কথা মনোযোগ সহকারে শোনার পরে আমরা বুঝতে পারি তার মানসিক অবস্থা খুবই নাজুক। এই অবস্থায় তার জন্য প্রয়োজন সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড। তাই এই নাজুক মানসিক অবস্থাকে লক্ষ্য রেখে প্রথমে মনো-সামাজিক সেবা প্রদান করে তার মানসিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হয়। তাকে মানসিক ভাবে চাপমুক্ত করার পর সে কিছুটা শান্ত হয়।
এবার তার পরিবারের সাথে কথা বলে পুরো বিষয়টি জেনে নিয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও ইউনিয়ন পরিষদ সচিবের সাথে যোগাযোগ করে শিশুর সমস্যাটি জানালে তারা কিছুটা অবাক হয়েই জানান, এই ধরনের কোন আইন বা বিধি-বিধান নেই । তারাও শিশুর পাশে আছেন বলে ১০৯৮ কে আশ্বস্ত করেন।
এ সংক্রান্ত সকল তথ্য সংগ্রহ করে পরবর্তীতে আমরা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করে শিশুর বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে, তিনি বলেন, ”আসলে বিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ১৬ বছর পার হলে জেএসসি পরীক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ নেই। সেই হিসেবে শিশুকে এই তথ্য টি দেওয়া হয়েছিল।” পরবর্তিতে জন্মনিবন্ধন অনুযায়ী শিশুর বয়স হিসাব করে দেখা যায় তার বয়স ১৬ বছরের কম। প্রধান শিক্ষককে এই তথ্যটি প্রদান করা হলে তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হোন এবং শিশুর রেজিস্ট্রেশনের সকল দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
পরের দিন পরীক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশন সম্পূর্ণ করার তথ্যটি খুব আনন্দিত হয়ে ১০৯৮ এ কল করে নিশ্চিত করে শিশু তামিম এবং ধন্যবাদ জানায় । শিশুদের কোমল মনের এমন নাজুক অবস্থায় আমরা ১০৯৮ শিশুদের পাশে ২৪ ঘন্টাই আছি বন্ধুর মত।
কেস স্টাডি ৪:
পিতামাতার অতি শাসনে শিশু যখন আত্বহত্যার ঝুঁকিতে!!
সিরাজগঞ্জ জেলার শিশু সাবিনা (ছদ্মনাম)। বয়স ১৫ বছর।স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী। পরিবারের বড় মেয়ে।স্বাভাবিক ভাবেই বড়দের প্রতি বাবা মায়ের প্রত্যাশা একটু বেশি থাকে। বিধিবাম দ্রুতই সেই স্বপ্ন বাবা মায়ের জীবনে, দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দেয়। স্নেহের সাবিনা এসএসসি পড়ুয়া অপরিনত এক ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।ফলে পড়াশুনায় অমনোযোগী হয়ে পড়া,বাহিরে যাওয়ার প্রবনতা,এবং মোবাইলে অধিক সময় ব্যয় করতে থাকে যা লক্ষ্যনীয়। সন্তানের এমন পরিবর্তনে বাবা মা হতাশ হয়ে পড়ে। সাবিনা স্বিকার করে ছেলেটিকে সে ভালোবাসে। এরপর সন্তানকে বুঝাতে থাকে বাবা মা, পারিবারিক শাসন নামে নির্যাতন, একপর্যায়ে ঘর বন্দি এবং স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয় । কিছু দিন এইভাবে চলতে থাকলে সাবিনা বলে, সে সম্পর্ক বাদ দিয়ে দিবে।সে স্কুলে যেতে চায়। বাবা মা বুঝিয়ে স্কুলে পাঠালে প্রথমত কয়েকদিন ঠিকঠাক থাকলেও ছেলেটির সাথে যোগাযোগ করে এবং কৌশলে পালিয়ে বিয়ে করার পরিকল্পনা করে,যা পরিবার বিষয়টি বুঝতে পেরে মেয়েকে পুনরায় বাড়িতে আটকে রাখে এর ফলে সাবিনা দিনে দিনে উগ্রমেজাজী, ঘরের সবকিছু ভাংচুর করা,গলায় ওড়না পেচিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। শিশুর মা বাবা নিরুপায়, ভীতি সন্ত্রস্ত এবং খুব চিন্তায় পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত শিশুর মামা ১০৯৮এ অনেক আশা নিয়ে এ সমস্যা সমাধানের জন্য ফোন করে ।সাইকোসোস্যাল কাউন্সিলর বিস্তারিত তথ্য শুনে কিছুটা বিস্মিত হন। শিশুর বাবা, মা, মামাকে কাউন্সিলিং শুরু হয়। তাদের এই মুহুর্ত থেকে কি করনীয়, এবং শিশু বান্ধব আচরণ করতে পরামর্শ প্রদান করে। শিশুর অভিভাবক পরামর্শ পেয়ে স্বিকার করেন, শিশুর সাথে যে আচরণ করেছেন তা ভুল করেছেন। এরপর কৌশলে শিশুর সাথে কথা বলা শুরু হয়,ধীরে ধীরে শিশুর আস্থা অর্জন সম্ভব হয়। শিশুর সাথে কাউন্সিলিং এর এক পর্যায়ে শিশু বুঝতে সম্মত হয় যে,সে যা চায় তা হয়তো পাবে,কিন্তু আত্মহত্যা করলে তাকে তো সব হারাতে হবে। শিশু জানায় সে বিয়ে করবে না, পড়াশুনা বাদ দিবে না,পড়ালিখা শিখে আত্বনির্ভরশীল হতে চায়,এর পর ছেলেটিকে ভালোভাবে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পরামর্শ দিবে, এখন পড়াশুনার সময় যা সে বুঝতে পেরেছে। শিশুর মামা জানায়, উনার প্রতি শিশুর আস্থা বেড়েছে।আশা করি আর কোন ঝুঁকিপুর্ন পদক্ষেপ নিবে না, ধীরে ধীরে বাবা মায়ের সাথেও সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটবে বলে তিনি আশাবাদী। তিনি জানান ১০৯৮ তাদের দৃষ্টি, চিন্তার পরিবর্তন এনেছেন।সেই সাথে এত কম সময়ে শিশুর ইতিবাচক আচরণ ও মানসিক পরিবর্তনে অবদান রাখায়,১০৯৮ এর সেবার প্রতি কৃজ্ঞতা প্রকাশ করেন।শিশু সাবিনা পুর্বের তুলনায় অনেক স্বাভাবিক হয়েছে,আবেগ নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা বেড়েছে!!
যোগাযোগ
চাইল্ড সেনসিটিভ সোস্যাল প্রটেকশন ইন বাংলাদেশ (সিএসপিবি) প্রকল্প, ফেইজ-2 ( ১ম সংশোধিত)
সমাজসেবা অধিদপ্তর (অষ্টম তলা)
ই-৮/বি-১, আগারগাঁও, ঢাকা
ফোন: ৫৮১৫৩৫৩৫, ৫৮১৫২৮৪২